রাজধানীর মুগদায় একশ টাকার জন্য বড় ভাইকে হত্যা!

রাজধানীর মুগদায় একশ টাকার জন্য বড় ভাইকে হত্যা!

অনলাইন ডেস্কঃ মাত্র একশ টাকার জন্য আপন বড় ভাইকে খুন করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এক ছোট ভাই। হত্যার পর বড় ভাইয়ের লাশ রেস্টুরেন্টের ভেতরে রেখে বাসায় গিয়ে গোসল করে ছোট ভাই। এমনকি রাতে বড় ভাই বাসায় না ফেরায় বাবার সঙ্গে তাকে খুঁজতেও বের হয়। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর মুগদায়।

নিহত বড় ভাইয়ের নাম জীবন ঘোষ (২৯) এবং খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত তার ছোট ভাই রাজীব ঘোষ (২৪)। গত ৭ মে রাজধানীর ৯৩/এ উত্তর মুগদাস্থ ‘জীবন ফুড ফ্যান্টাসি’ নামক দোকানের ভেতরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের বাবা নারায়ণ ঘোষ মুগদা থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, “গত ১০ জানুয়ারি ৯৩/এ উত্তর মুগদা বাসার নিচতলায় ভাড়া নিয়ে আমার বড় ছেলের নামে ‘জীবন ফুড ফ্যান্টাসি’ নামে একটি দোকান শুরু করি। যেখানে ইফতারসামগ্রী বিক্রি করা হয়। আমি মাঝে মাঝে দোকানে যেতাম। আমার দুই ছেলে জীবন ঘোষ ও রাজীব ঘোষ নিয়মিত দোকান পরিচালনা করতো। রমজানে দুই ভাই ইফতারসামগ্রী বিক্রি করে হিসাব নিকাশ শেষ করে দোকান বন্ধ করতে রাত আনুমানিক ৭/৮টা বেজে যায়। প্রতিদিনের মতো গত ৭ মে আমার ছোট ছেলে রাজীব ঘোষ সকাল ১১টায় ইফতার বানানোর জন্য দোকানে যায়।

ওইদিন বেলা দেড়টার দিকে আমার বড় ছেলে জীবন দুপুরের খাবার খেয়ে ছোট ভাইয়ের জন্য বাসা থেকে ভাত নিয়ে যায়। বিকাল আনুমানিক ৬টার দিকে আমার মেঝ ছেলে মিঠুন ঘোষ দোকানভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার জন্য বাসা থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে দোকানে যায়। সে টাকা জীবন ঘোষের কাছে দিয়ে ইফতার নিয়ে বন্ধু রতনের বাসায় চলে যায়। এরপর জীবন ও রাজীব দুই ভাই ইফতার বিক্রির পর ছোট ভাই রাজীব বাসায় চলে যায়। তার মা দরজা খুলে দেওয়ার পর তাড়াহুড়ো করে রাজীব গোসলখানায় চলে যায়। রাজীব গোসল থেকে বের হলে আমি তাকে জিজ্ঞাস করি, ‘জীবন কোথায়?’ তখন সে আমাকে জানায়, ‘জীবন দোকানের পেছনের গেটে তালা দিয়ে বের হয়েছে, সে গেটে তালা লাগানো দেখে আসছে।’ দোকানের পেছন থেকে বের হওয়ার জন্য আলাদা একটি গেট রয়েছে। আমরা মোবাইলে টাকা না থাকায় আমি রাত আনুমানিক পৌনে ৮টার দিকে পাশের বাসার ভাড়াটিয়ার মোবাইল দিয়ে জীবনের মোবাইলে ফোন দিলে তার নম্বরটি বন্ধ পাই। আমি ভাবছি হয়তো মোবাইলের চার্জ শেষ তাই মোবাইল বন্ধ।

অথবা জীবন মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। বাইরে তখন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল, হয়তো সে আটকা পড়েছে, বাসায় আসতে পারছে না। রাত ৯টার দিকে আমি ও আমার ছোট ছেলে রাজীব বাসা থেকে দোকানের ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে জীবনকে খুঁজতে বের হই। রাজীব দোকানের শাটার খুলে লাইট জ্বালিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে, বাবা ভাই নাই। এসময় আমি দোকান থেকে একটু দূরে ছিলাম। ছোট ছেলের চিৎকার শুনে আমি দ্রুত দোকানে যাই। দোকানের ভেতরে গিয়ে দেখি, জীবনের দেহ দোকানের মেঝেতে পড়ে আছে। চারপাশে রক্ত। দোকানে রাখা হাত মোছার গামছা জীবনের গলায় পেঁচানো, তার মাথার পেছনে গভীর ক্ষত। সেই ক্ষত থেকেই রক্ত ঝরছে। আমি তখন ডাক চিৎকার করতে থাকলে আশেপাশের লোকজন এসে জড়ো হয়। এরপর খবর পেয়ে মুগদা থানা পুলিশ আসে।’

এই হত্যাকাণ্ডের ওই এলাকার সকল সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। এছাড়া মোবাইল ট্র্যাকিং ও ফুটেজ পর্যালোচনা করে। নিহত জীবনের ছোট ভাই রাজীব ও মিঠুনসহ পরিবারের অনেককেই দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে।

মুগদা থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. মাসুদুর রহমান জানান, খুনিকে শনাক্ত করতে ঘটনাস্থলের বিপরীত পাশের ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেন তারা। পর্যালোচনা করে দেখা যায় নিহত জীবনের ছোট ভাই রাজীবের ওই সময়ের মুভমেন্ট সন্দেহজনক ছিল। সে দোকান থেকে বের হয়ে ইট ফেলে। তাকে অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল। তার আচরণ স্বাভাবিক ছিল না। এমনকি সে বাসায় গিয়ে বলেছিল, বড় ভাই জীবন দোকান বন্ধ করেছে। কিন্তু সিসি ক্যামেরায় রাজীবকে দোকান বন্ধ করতে দেখা যায়। এরপর আরও কিছু বিষয় সন্দেহ করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তথ্য-প্রমাণ মিলে যাওয়ার পর রাজীবকে গ্রেফতার করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রহিদুল ইসলাম জানান, দোকানের ভেতরে আসামি রাজীব ঘোষ তার আপন বড় ভাইকে মাত্র ১০০ টাকার জন্য পেছন দিক থেকে ইট দিয়ে প্রথমে মাথায় সজোরে একাধিকবার আঘাত করে এবং এরপর গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। আপন ভাইকে হত্যার পর কৌশলে জীবন ঘোষের মৃতদেহ দোকানের ভেতরে ফেলে রেখে যায়। দোকানের শাটার তালাবদ্ধ করে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ইট রাস্তায় এবং দোকানের চাবি ম্যানহোলের ভেতরে ফেলে দিয়ে বাসায় গিয়ে গোসল করে ফেলে।

তিনি আরও জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত জব্দ করে। রাজীব ঘোষের তথ্যানুযায়ী রক্তমাখা ইট ও বাসার বাথরুম থেকে হত্যাকাণ্ডের সময় তার পরনে থাকা গেঞ্জি জব্দ করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের সবুজবাগ জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) রাশেদ হাসান জানান, ৮ মে রাতে রাজীব ঘোষকে গ্রেফতার করার পর ৯ মে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বর্তমানে সে কারাগারে।

সংবাদটি পছন্দ হলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themesbazartvsite-01713478536