যে কারণে লিথিয়াম সোনার চেয়েও দামি!

যে কারণে লিথিয়াম সোনার চেয়েও দামি!

অনলাইন ডেস্ক: মানুষ লিথিয়ামের কথা জানে দুইশ’ বছর ধরে। তবে এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করছে মাত্র কিছুদিন আগে, যখন থেকে লিথিয়াম ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাটারি বানাতে। অনেকেই ইতিমধ্যে একে ডাকতে শুরু করেছেন এ যুগের স্বর্ণ বলে! প্রাচীনকালে কোনো পদার্থের দাম নির্ধারিত হতো তার স্থায়িত্ব দিয়ে। তাই ধাতব পদার্থের দাম ছিল সবচেয়ে বেশি।

যে ধাতুগুলো সহজে বাতাস, পানি বা পরিবেশের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না সেগুলোর মূল্যই ছিল সবচেয়ে বেশি। যেমন স্বর্ণ সহজে কারও সঙ্গেই বিক্রিয়া করে না, তাই তা অনেক দামি। অপরদিকে, লোহা খুব সহজেই পানি আর অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হয়ে যায় মরিচা। তবে পদার্থের দামের এই ধারণায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে।

বিশ্বজুড়ে যত শিল্পায়ন হয় ততই বাড়তে থাকে শক্তির চাহিদা। যে পদার্থ শক্তি উৎপাদনে যত বেশি ব্যবহার্য, তার দাম নির্ধারিত হয় তত বেশি। হঠাৎ করেই তাই ধনী হয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্য, বিশাল তেলের খনি আবিষ্কার হওয়ায়। শক্তির উৎস হিসেবে চমৎকার হওয়ায় কয়লাকে অনেক আগে থেকেই ডাকা হয় কালো সোনf বলে। অপরদিকে পারমাণবিক শক্তির উৎস ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম হয়ে ওঠে সবচেয়ে দামি মৌল।

ইতিহাসের নতুন নতুন আবিষ্কার সবকিছু বদলে দেয়। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির যুগ শুরু হওয়ায় মনে হচ্ছে আরেকটা বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এখন অধিকাংশ ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি শক্তি পাচ্ছে এই লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থেকেই। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির সাফল্য এত বেশি যে সবাই বুঝতে পারছেন, কিছুদিনের মধ্যে সব ইলেকট্রিক যন্ত্র চালিত হবে লিথিয়াম দিয়ে, যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

পৃথিবীপৃষ্ঠে সব জায়গায় লিথিয়ামের ঘনত্ব সমান নয়। ধারণা করা হচ্ছে, আন্দিয়ান বা মার্কিন দেশগুলোতে আছে লিথিয়ামের বড় ধরনের মজুত। তার মানে হল এই দেশগুলো হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য! আলোচনার টেবিলে নবীন হলেও লিথিয়ামের গল্প আসলে খুব প্রাচীন। বিগব্যাংয়ের পরপরই হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সঙ্গে অন্য যে মৌলটি তৈরি হয়েছিল তা ছিল লিথিয়াম।

পরিমাণে অল্প হলেও প্রাচীনত্বের গৌরবের অংশীদার তো! এরপর নক্ষত্রে চলা নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম থেকেও তৈরি হয়েছে লিথিয়াম। তৈরি হয়েছে বেরিলিয়াম বা অন্য কোনো মৌলের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকেও। প্রাণীদেহ সৃষ্টিতে কার্বন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ায় লিথিয়ামের পরের গল্প মানুষের চোখে পড়ে মাত্র দুইশ’ বছর আগে।

১৮০০ সালে পেটালাইট নামক একটি খনিজ আবিষ্কৃত হয়। রসায়নের ইতিহাসে বিখ্যাত ব্যক্তি জ্যাকব বার্জেলিয়াসের ছাত্র জোহান অগাস্ট আরফেডসন পেটালাইট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ১৮১৭ সালে আবিষ্কার করেন লিথিয়াম। বার্জেলিয়াস এর নাম দেন ‘লিথোস’। গ্রীক শব্দ লিথোসের অর্থ পাথর। লিথিয়ামের চমৎকার ভৌত, রাসায়নিক ও তড়িৎ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের জন্য ব্যাটারির বাইরেও নানান ব্যবহার আছে।

যেমন- লিথিয়াম নায়োবেইট ব্যবহৃত হয় অরৈখিক আলোকবিজ্ঞানে। প্রকৌশলে লিথিয়াম ব্যবহৃত হয় উচ্চতাপমাত্রার লুব্রিক্যান্ট হিসেবে, সংকর ধাতু মজবুত করতে বা তাপ পরিবহনে। রাসায়নিক শিল্পেও রয়েছে লিথিয়ামের বহুল ব্যবহার। জৈব লিথিয়াম একটি শক্তিশালী ক্ষার ও নিওক্লিওফাইল, নানা বস্তু বানাতে এর গুরুত্ব অনেক।

আধুনিক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পলিমার। পলিমার তৈরিতে জৈব লিথিয়ামের ভূমিকা অন্যতম। লিথিয়াম প্রভাব ফেলে মানুষের নার্ভাস সিস্টেমেও, তাই মুড স্ট্যাবিলাইজিং ওষুধ বাতেও আছে লিথিয়ামের ব্যবহার। লিথিয়ামের তেজস্ক্রিয় বিকিরণে উৎপন্ন হয় হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ট্রিটিয়াম,তাই নিউক্লিয়ার গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ এই ধাতু।

লিথিয়ামের এত এত ব্যবহারের দরুন প্রতিবছর ৭ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ছে এর বৈশ্বিক চাহিদা। বর্তমানে লিথিয়াম কার্বনেটের বার্ষিক চাহিদা প্রায় পৌনে দুই লাখ টন। যার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ব্যবহার হয় ব্যাটারি তৈরিতে। জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন হওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সবাই দিন দিন ঝুঁকছে বিকল্প উৎসের দিকে।

এক হিসাবে ২০৫০ সালের মধ্যে সব গাড়ি জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে চলবে ব্যাটারিতে। বলাবাহুল্য এক্ষেত্রে লিথিয়ামের গুরুত্ব ও চাহিদাও বাড়বে বহুগুণ। অপরদিকে, নিউক্লিয়ার ফিউশনে ডিউটোরিয়ামের পাশাপাশি ব্যবহার করা যেতে পারে ট্রিটিয়াম। সেক্ষেত্রে লিথিয়ামের চাহিদা বাড়বে আরও, যেহেতু ট্রিটিয়ামের একটি কার্যকরী উৎস তেজস্ক্রিয় লিথিয়াম।

খনিজ পাথর থেকে লিথিয়াম আহরণ খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার। সাগরের পানিতেও যথেষ্ট পরিমাণ লিথিয়াম লবণ আছে, কিন্তু সেখান থেকেও পরিশোধন কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। তাই লিথিয়াম প্রধানত (প্রায় ৮৩ শতাংশ) লবণাক্ত লেক বা সল্ট প্যান থেকেই আহরিত হয়। প্রথমে, লবণাক্ত পানিকে সূর্যতাপে বাষ্পীভূত করে লিথিয়াম লবণের ঘনত্ব বাড়ানো হয়। এরপরে একে সোডার(সোডিয়াম কার্বনেট) সঙ্গে বিক্রিয়া করালে নিচে জমা হয় লিথিয়াম কার্বনেট। তারপর লিথিয়াম কার্বনেট পাঠিয়ে দেয়া হয় নির্দিষ্ট শিল্প কারখানায়।

পৃথিবীতে মোট কতটুকু লিথিয়াম মজুত আছে তার সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই, এমনকি এই হিসাব করাও অত্যন্ত কঠিন। তবে প্রতিবছর যে পরিমাণ লিথিয়াম পরিশোধিত হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে বছরে উৎপাদিত গাড়ির সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। সব গাড়ি যদি হাইব্রিড কারে রূপান্তরিত করা হয়, তাতেও লিথিয়াম কার্বনেটের উৎপাদন করতে হবে দ্বিগুণ!

হাইব্রিড গাড়ি হলো জীবাশ্ম জ্বালানি ও লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির সমন্বয়ে চলা গাড়ি। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির শক্তি সাত কিলোওয়াট ঘন্টা। প্রতি কিলোওয়াট ঘন্টা শক্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৮০০ গ্রাম লিথিয়াম কার্বনেট। এসব সংখ্যা ভয় ধরানো। কারণ খুব সহজে ধারণা করা যায় যে, লিথিয়ামের মজুত যতই থাকুক, চাহিদার সমান লিথিয়াম উৎপাদন খুবই কঠিন হবে। সম্ভবত কয়েক যুগে ফুরিয়েও যাবে।

এর থেকে উত্তরণের উপায় হতে পারে নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তির আবিষ্কার। তাতে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উপর নির্ভরতা কমবে। আরেকটি উপায় হতে পারে লিথিয়াম রিসাইক্লিং বা পুন প্রক্রিয়াকরণ। আশার কথা হলো, লিথিয়ামের গলনাঙ্ক মাত্র ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় এর রিসাইক্লিংও বেশ সহজ। একইসঙ্গে লিথিয়ামের ক্লোরাইড, কার্বনেট বা ফসফেট যৌগের পানিতে দ্রাব্যতা কম হওয়ায় এর রিসাইক্লিং আরো সহজসাধ্য।

তাই একটি কার্যকর রিসাইক্লিং পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারলে এবং সহজ পরিশোধন পদ্ধতি বের করতে পারলে লিথিয়াম-আয়ন নিঃসন্দেহে বিপ্লব এনে দেবে। শতবর্ষ আগে মধ্যপ্রাচ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির বিশাল আধার আবিষ্কারের পরে ভূ-রাজনীতি ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছিল। লিথিয়াম সম্ভবত এমন কিছুই করতে যাচ্ছে! জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে দুশ্চিন্তাতেও হয়তো কিছু আশার বাণী শোনা যাবে। তাই লিথিয়ামকে এই শতাব্দীর স্বর্ণ বললে মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না। আসলে লিথিয়াম সোনার চেয়েও দামি।

সংবাদটি পছন্দ হলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আকলিমা রশীদ ঢালীপিংকী , কসবা প্রতিনিধি,ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের দুরুইল গ্রামে ফেসবুকে লেখা আর রাস্তাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত হামলায় জিলানীর বাড়িঘর দোকানপাট ভাংঙ্গচোর-আহত ৪,ধানায় মামলা গ্রেফতার-৪ সংবাদ পাওয়া যায়।
ঘটনা প্রকাশ,ফেসবুকে লেখা আর রাস্তার তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে কসবা উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের দুরুইল গ্রামে দীর্ঘদিন থেকে দুই পক্ষের মাঝে বিরোধ চলমান রয়েছে বলে গ্রামবাসী জানান। এর জের ধরে একই গ্রামের মোবারক হোসেন মানিকের নেতৃতে সোলেমান মিয়ার পুত্র শাহীন আল মামুন লাঠিয়াল বাহিনীর গ্রামে চরম উওেজনা বিরাজ করছে বলে গ্রামের উওর পাড়ার লোকজন তাও জানান।
মোবারক হোসেন মানিকের জনবল,লাঠি বল,অর্থবলে গ্রামের সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে মনে না করে যখন যা মনে চায় তাই করেন বলে ক্ষতিগ্রস্থরা তাও জানান। তাদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না বলেও জানান। মোবারক হোসেন মানিক এর নেতৃত্বে একদল যুবক ফেসবুকে মিথ্যা কাল্পনিক কথা লিখে গ্রামে অপ প্রচারসহ জমি জমা দখল করার বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে।
গত ৮ জুলাই দিনের প্রায় সাড়ে তিনটায় ফেসবুকে লেখা আর রাস্তার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোবারক হোসেন মানিকের হুকুমে শাহীন আলম মামুনসহ ৩০/৪০জন দাঙ্গাবাজ হাতে রাম দা,রড,হকস্টীক লাঠি সোটা নিয়ে একই গ্রামের উওর পাড়ার মৃত মিরণ মিয়ার পুত্র জিলানীর বাড়ি ঘর দোকান পাটে ফিম্মিটাইলে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধনসহ লুটপাট করার অভিযোগ উঠেছে।
তাদের ফিম্মিটাইলের হামলায় মো: চুনি মিয়া (৭৫),মোছাম্মদ সুলতানা বেগম(৩৫), জুলেখা বেগম(২৪), মো:বাবুল মিয়া(৩২)সহ ৪জন গুরুত্বর অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে মামলা বাদী মো: জিলানী সাংবাদিকদেরকে জানান। এর মধ্যে মো: চুনি মিয়া ও মোছাম্মদ সুলতানা বেগম কুমিল্লা মেডিক্যাল হাসপাতালে আস্কজনক অবস্থায় আছেন।
এই ঘটনায় শাহীন আলম মামুন (৩০), উজ্জল মিয়া (৪০),রমজান (২৫) ,রাসেল(২৫)সহ ১৫জনকে আসামী করে কসবা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। কসবা থানা মামলা নং-১৯। ঘটনার সংবাদ পেয়ে কসবা থানা পুলিশ ব্যাপক তৎপরতা অব্যাহত চালিয়ে ঐদিনই দেশীয় অস্ত্র সস্ত্রসহ শাহীন আলম মামুন, উজ্জল মিয়া,রমজান ও রাসেলকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃতদেরকে ৯ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে প্রেরণ করেন। মামলার তদন্ত র্কমর্কতা কসবা থানার এস আই মো:আনোয়ার হোসেন গ্রেফতারের সততা স্বীকার করেন এবং অন্য আসামীদেরকে গ্রেফতারের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন বলে সাংবাদিকদেরকে জানান। ক্ষতিগ্রস্থরা ঘটনার অন্তরালে মূল নায়ক ও হুকুমদাতা মোবারক হোসেন মানিকের নির্দেশে লাঠিয়াল শাহীন আলম মামুন,উজ্জল,ফরহাদ,জামাল,সুমন,মশিউর রহমান রাঙ্গা,সমুন মিয়া গংদের কবল থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে আইনমন্ত্রীর কাছে ন্যায়বিচার দাবী করছেন।
অপর দিকে দায়েরকৃত মামলা তুলে না নিলে মামলার বাদী ও তার পরিবারের সদস্যসহ স্বাক্ষীদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে ঘটনার অন্তরালে মূল নায়ক হুকুমদাতা মোবারক হোসেন মানিক সহ তার লোকজন বলে মামলার বাদী জিলানী সাংবাদিকদেরকে জানান।
দিন দুপুরে লাঠিয়ালবাহিনীর দল নেতা শাহীন আলম মামুনসহ তার সঙ্গবদ্ধ দল রাম দা,লৌহার রড,মহকস্টিক নিয়ে প্রকাশ্য হামলাসহ বাড়ি ঘর দোকানপাটে তাগুব চালানোর ঘটনাটি নিন্দাজ্ঞাপন করে গ্রামের সচেতনমহল ন্যায় বিচার দাবী করেছেন আইনমন্ত্রীর কাছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দোকানপাট ভাংঙ্গচোর আহত ৪ গ্রেফতার ৪

themesbazartvsite-01713478536