জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে মশাবাহিত রোগবালাই

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে মশাবাহিত রোগবালাই

অনলাইন ডেস্ক: আগস্টে ডেঙ্গুর ব্যাপকতা ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের।বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে এডিসবাহিত এ রোগে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর হার প্রতি বছরই বাড়ছে। বাংলাদেশ ডেঙ্গু ভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে বহু মানুষ চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। চিকুনগুনিয়ার পর এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। এডিস মশা চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর ভাইরাস বিস্তারের একমাত্র মাধ্যম। এ ছাড়া জিকা ভাইরাস বিস্তারের ক্ষেত্রেও দায়ী এই মশা। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে বেড়েছে এডিস মশাবাহিত এসব রোগের প্রকোপ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ১৯৭০ সালের আগে ডেঙ্গুর অস্তিত্ব ছিল মাত্র ৯টি দেশে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে তা ছড়িয়ে পড়ে ১০০টিরও বেশি দেশে। বর্তমানে বিশ্বের আড়াই কোটি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। যার ৭০ শতাংশের বাস এশিয়া অঞ্চলে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোলের তথ্য মতে, ডেঙ্গু নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পুরো এশিয়া। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায়ও দেখা গেছে কলেরা, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরের মতো মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখছে জলবায়ু পরিবর্তন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ছে। হিমবাহ গলছে। খরা, অতিবৃষ্টি ও ঝড় হচ্ছে। এসবের ফলে বন্যার ঝুঁকি এবং খাদ্য সংকট বাড়বে। ফসলের ফলন এবং পানির প্রাপ্যতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, হুমকির মুখে পড়বে মানুষের স্বাস্থ্য।
গবেষকরা বলছেন, মানুষের শরীর থেকে রক্ত আহরণের পর এডিস মশা স্বচ্ছ জলাশয়ে ডিম পাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি। উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় মশা মানুষের শরীর থেকে বারবার রক্ত নিতে চায়। এ বছর আগাম বৃষ্টিপাত শুরু হলেও ভারি বৃষ্টি বলতে গেলে হয়নি। প্রকৃতির এই আচরণ এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ছে।

প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতিসংঘ নিয়োজিত ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন তুলে ধরে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ভোরের কাগজকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং এর বিরূপ প্রভাব যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়বে এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন। তাদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব জায়গায় এক রকম পড়বে না। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ক্ষতিকর প্রভাব দরিদ্র দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগে ছড়াবে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত আইপিসিসির চতুর্থ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণায়ন বাড়বে। এতে বিভিন্ন ভেক্টর এবং পোকা-মাকড় বাড়বে। ফলে ভেক্টরবাহিত রোগবালাই যেমন; ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগ বাড়বে।
মশা বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল লতিফ ভোরের কাগজকে বলেন, প্রকৃতিতে অনেক পাখি ও প্রাণী আছে যারা মশা খায়। মশার অন্যতম শিকারি বাদুড়। এ ছাড়া হাঁসও মশা খায়। বেগুনি মার্টিন পৃথিবীতে মশা খাওয়ার জন্য বেশি পরিচিত। গিলে, টেনসও মশা খায়। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়নের মতো বিভিন্ন কারণে দেশে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও কীটপতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা বিলুপ্তির পথে। ফলে মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। এ ছাড়া উইসকনসিন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণাও দেখা গেছে, প্রাকৃতিক আবাসে বাদুড় অনেক বেশি মশা খায়। ট্যাডপোলস ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাঙও প্রচুর মশা এবং তাদের লার্ভা খায়।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সাব্রিনা ফ্লোরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু বাংলাদেশেই নয় মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনসহ সমুদ্রবেষ্টিত কিংবা সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কারণে জয়বায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের তাপমাত্রা এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়ছে। তাপমাত্রা বাড়লে মশার প্রজনন দ্রুত হয়। স্ত্রী জাতীয় মশার কার্যকারিতা বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশা ও এর প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
আইসিডিডিআরবির জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ড. কামরুন নাহার ভোরের কাগজকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বেই তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। বাড়ছে আর্দ্রতাও। এমন পরিবেশ কিছু রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক। এই পরিবেশে মশার প্রজনন ক্ষমতা বেড়ে যায়। স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বংশ বিস্তার করে। ফলে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকার প্রকোপ বাড়ছে। মশা নিধন এবং এর বংশ বিস্তার রোধ করা না গেলে এ ধরনের রোগগুলো ফিরে ফিরে আসবে। আর প্রাদুর্ভাবও বাড়বে।

সংবাদটি পছন্দ হলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themesbazartvsite-01713478536